শিরোনাম

জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ: এক উপেক্ষিত কিংবদন্তী

বহু ভাষাবিদ, জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জগতে এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি ভাষা আন্দোলনের প্রথম দার্শনিক। ১৯২১ সাল থেকেই তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের আগেই তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বাংলার দাবি তুলে ধরতে থাকেন।

বাংলা ভাষার পক্ষে লেখনী ধারণ, সভা সমিতিতে ভাষণ, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ সবকয়টিতেই তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।

তিনি প্রায় ৩০টি ভাষা জানতেন। ১৮টি ভাষায় ছিলেন সুপণ্ডিত। কিন্তু তার অন্তরের ভাষা ছিল বাংলা। মাতৃভাষার প্রতি তার ভালোবাসা ছিল প্রবাদ প্রতীম। তিনি বাংলা একাডেমিরও স্বপ্ন দ্রষ্টা। তিনি বলেছিলেন, মা, মাতৃভাষা, মাতৃভূমি প্রত্যেক মানুষের পরম শ্রদ্ধার বস্তু।

চর্যাপদ বিষয়ক গবেষণা, বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে তার মতবাদ, বাংলাভাষার জন্মসাল বিষয়ে তার বক্তব্য, বাংলা বর্ষপঞ্জির সংস্কার, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লেখা, বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান প্রণয়ন সবই তার উল্লেখযোগ্য কীর্তি।

নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না শহীদুল্লাহর নাম এবং নাম জানলেও জানে না কী তার অবদান। তাদের জন্যই বলছি, বাংলাভাষার গবেষক হিসেবে মুহম্মদ শহীদুল্লাহর প্রধান অবদান হলো, চর্যাপদের বিষয়বস্তু এবং তার কবিদের পরিচয় তুলে ধরা, বাংলাভাষার উৎপত্তিকাল নির্ধারণ করা (শহীদুল্লাহর মতে এটি ৬০০ থেকে ৭০০ অব্দের মধ্যে), বাংলাভাষার উৎপত্তি যে গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে সেটি বলা, আঞ্চলিক ভাষার অভিধান প্রণয়ন করা এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস প্রণয়ন।

তবে আমাদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে তার প্রধান অবদান ভাষা আন্দোলনে দার্শনিকের ভূমিকা পালন করা। শহীদুল্লাহ বাঙালি মুসলমানকে বাঙালি হয়ে উঠতে শিখিয়েছিলেন। তিনি বাঙালি মুসলমানকে শিখিয়েছিলেন মাতৃভাষাকে ভালোবাসতে। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন ধর্মনিষ্ঠ। তিনি ইসলাম ধর্মের অনুশাসনগুলো নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলতেন। অথচ তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ। তিনি তার জীবনাচরণের মধ্য দিয়ে জাতিকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে নিজের ধর্মে নিষ্ঠাবান হয়েও অসাম্প্রদায়িক ও ধর্ম নিরপেক্ষ হওয়া যায়। স্মরণ করিয়ে দেই তার অমর উক্তি ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোন আদর্শের কথা নয় এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে মালা তিলক টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকার জো-টি নেই।’

এই কথা শহীদুল্লাহ বলছেন ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে মূল সভাপতির ভাষণে। তখন চারিদিকে যখন পাকিস্তানি হওয়ার জিগির তখন শহীদুল্লাহ জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে আমাদের ধর্ম যাই হোক আমরা বাঙালি।

ধর্মকেও তিনি যতটা বুঝতেন ততোটা অন্য অনেক ধর্ম বিষয়ক পণ্ডিতও বুঝতেন কিনা সন্দেহ। কারণ একাধারে কোরআন হাদিস ও গীতা, বেদ, বাইবেল পড়া মানুষ, আরবি, ফার্সি, হিব্রু এবং সংস্কৃত, পালি, প্রাচীন পাহলবি এবং ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান জানা মানুষ সারা বিশ্বেই বিরল। তিনি সনাতন বৈদিক শাস্ত্র ও আর্যভাষা ও সাহিত্য যেমন জানতেন তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি, ভাষা, আব্রাহামীয় ধর্মসমূহকেও জানতেন।

আমার ব্যক্তিগত মত হলো, এ কারণেই শহীদুল্লাহকে নিয়ে রক্ষণশীল এবং প্রগতিশীল দুই দলের মধ্যেই কিছুটা অস্বস্তি রয়েছে। প্রগতিশীলরা শহীদুল্লাহর লম্বা দাড়ি, টুপি এবং ধর্ম নিষ্ঠার বিষয়টিকে অস্বস্তির সঙ্গে দেখে। তাকে ‘যথেষ্ট প্রগতিশীল’ মনে করে না। অন্যদিকে মুসলিম রক্ষণশীলরা তাকে ইসলামী জ্ঞানে সুপণ্ডিত হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য হলেও তার বাংলা ভাষাপ্রীতি, তার সংস্কৃত ভাষার জ্ঞান, অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্ম নিরপেক্ষ মনোভাবে বিরক্তি বোধ করে।

হয়তো এসব কারণেই বাংলা মায়ের এ কৃতী সন্তান উপেক্ষিত এবং বিস্মৃতপ্রায়। তার মানস প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির মূল ভবনের নামকরণ করা হয়েছে তার নামে। খুব ভালো কথা। বাংলা একাডেমির অফিসিয়াল ওয়েব সাইটেও শহীদুল্লাহর ছবি রয়েছে। কিন্তু তিনি যেন শুধু ছবি ও নাম। তার কোন অবদানের কথা বিস্তারিত কোথাও নেই।

একথা বলছি, কারণ বাংলা একাডেমির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে একাডেমির প্রকাশনার তালিকা খুঁজে শহীদুল্লাহর রচনাবলীর হদিস পাওয়া যায়নি। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর রচনাবলীর তিনটি খণ্ড পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল। পঞ্চম খণ্ড তো দূরের কথা। চতুর্থ খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল কিনা তার কোন হদিস নেই।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ তার জীবিতকাল অবধি ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়ে ‘দৌড়ঝাঁপ’ করে শহীদুল্লাহর বিভিন্ন লেখা সংগ্রহ করে বাংলা একাডেমিতে জমা দেন। মূলত, তারই চেষ্টায় ও অক্লান্ত পরিশ্রমে তিন খণ্ড পর্যন্ত প্রকাশ হয়। চতুর্থ ও পঞ্চম খণ্ডের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় উপাদান তিনি সংগ্রহ করে দেন। তারপরও বাংলা একাডেমি থেকে চতুর্থ ও পঞ্চম খণ্ড প্রকাশ হয়নি।

শহীদুল্লাহ রচনাবলীর প্রথম তিন খণ্ডও বহুদিন আউট অব প্রিন্ট।

শুধু তাই নয়, বাংলা একাডেমি প্রকাশিত গ্রন্থ তালিকায় জীবনী গ্রন্থের যে সিরিজ রয়েছে সেখানেও শহীদুল্লাহর কোন জীবনী প্রকাশ হয়েছিল কিনা তার উল্লেখ নেই। আমার জানামতে শহীদুল্লাহর জীবনী প্রকাশ হয়েছিল। কিন্তু সেটির উল্লেখ বাংলা একাডেমির প্রকাশিত বইয়ের অফিসিয়াল তালিকায় নেই। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত গবেষণা গ্রন্থসমূহের তালিকাতেও শহীদুল্লাহর কোন প্রসঙ্গ নেই। তারমানে ধরে নিতে হবে বাংলা একাডেমি থেকে শহীদুল্লাহ বিষয়ক কোন গবেষণা গ্রন্থও প্রকাশিত হয়নি।

একাডেমির কথা এ পর্যন্তই বললাম কারণ প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আমার পারিবারিক সূত্রে এক রকম মমতা রয়েছে।

এবার আসি অন্য প্রসঙ্গে। ঢাকায় শহীদুল্লাহর নামে ‘ছোট চিপা গলি টাইপ’ একটি রাস্তা রয়েছে বটে, কিন্তু সে রাস্তায় কোন সাইন বোর্ড নেই বলে এটি যে শহীদুল্লাহর নামে তা কেউই জানে না। ওই রাস্তায় যে সব ভবন রয়েছে সেখানেও রাস্তার নাম লেখা নেই। ওই রাস্তায় গিয়ে আমি নিজে সাংবাদিকসুলভ কৌতুহলে পথচারী থেকে শুরু করে মুদির দোকানদার অবধি যাকেই জিজ্ঞাসা করেছি কেউ বলতে পারেনি এ রাস্তার নাম শহীদুল্লাহর নামে কিনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*