মাস্টারদা সূর্য সেনের ৮৮তম ফাঁসি দিবসে নানা আয়োজন

বায়েজিদ ডেস্ক :  ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেনের ৮৮তম ফাঁসি দিবস মঙ্গলবার। ১৯৩৪ সালের এদিনে তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকার বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে অকুতোভয় দেশপ্রেমিক মাস্টারদা সূর্য সেন ও তারেকশ্বর দস্তিদারকে ফাঁসির দণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে হত্যা করে।

জানা গেছে, সূর্য সেন ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়ায় অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা রাজমনি সেন এবং মা শশী বালা সেন। শৈশবে বাবা-মা হারানো সূর্য সেন কাকা গৌরমনি সেনের কাছে মানুষ হয়েছেন। দয়াময়ী উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার প্রথম পাঠ শুরু।
তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন এবং চট্টগ্রামে ফিরে এসে আচার্য্য হরিশ দত্তের জাতীয় স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯১৯ সালে তিনি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার কানুনগোপাড়ার নগেন্দ্রনাথ দত্তের কন্যা পুষ্পকুন্তলা দত্তকে বিয়ে করেন।

১৯১৬ সালে বহররমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজের ছাত্র থাকাকালীন সূর্য সেন সরাসরি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হন। বিপ্লবীদের গোপন ঘাঁটি এ কলেজে তিনি অধ্যাপক সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর সান্নিধ্যে আসেন। তিনি যুগান্তর দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সূর্য সেনকে তিনি বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষা দেন। সূর্য সেন ১৯১৮ সালে শিক্ষাজীবন শেষ করে চট্টগ্রামে এসে গোপনে বিপ্লবী দলে যোগ দেন। বেঙ্গল রেজিমেন্টের নগেন্দ্রনাথ সেন ১৯১৮ সালে চট্টগ্রামে এসে সূর্য সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী ও চারুবিকাশ দত্তের সঙ্গে দেখা করেন।

১৯৩২ সালের জুন মাসে মাস্টারদা প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্তকে বোমা সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম কারাগার ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু সে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। এ ঘটনায় ১১ জন বিপ্লবী গ্রেফতার হন। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতা পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে সফল আক্রমণ চালান, তবে তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং সায়নাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

১৯৩০ সালের ২৪ জুলাই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলা বিশেষ ট্রাইবুনালে শুরু করে। এ ঘটনার পরে মাস্টারদা পটিয়ার কাছে গৈরালা গ্রামে আত্মগোপন করেন। ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে সেখানে এক বৈঠকে ছিলেন কল্পনা দত্ত, শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত, ব্রজেন সেন আর সুশীল দাসগুপ্ত। ব্রজেন সেনের সহোদর নেত্র সেন সূর্য সেনের উপস্থিতির খবর পুলিশকে জানিয়ে দেয়।

রাত প্রায় ১০টার দিকে পুলিশ আর সেনাবাহিনী ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িটি ঘিরে ফেলে। রাতের অন্ধকারে গুলি বিনিময় করে কল্পনা দত্ত,শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত আর সুশীল দাসগুপ্ত পালিয়ে গেলেও রাত ২টার দিকে অস্ত্রসহ সূর্য সেন ও ব্রজেন সেন ধরা পড়েন।

১৯৩৩ সালে সূর্য সেন, তারকেশ্বর দস্তিদার এবং কল্পনা দত্তের বিশেষ আদালতে বিচার হয়। ১৪ আগস্ট সূর্য সেন ও তারেকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসির রায় হয় এবং কল্পনা দত্তের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কারাগারে সূর্য সেন ও তারেকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসি কার্যকর হয়।
তাদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর কিংবা হিন্দু সংস্কার অনুযায়ী পোড়ানো হয়নি। ফাঁসির পর মরদেহ দুইটি জেলখানা থেকে ট্রাকে করে ৪ নম্বর স্টিমার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর মৃতদেহ দুটোকে ব্রিটিশ ক্রুজারে তুলে নিয়ে বুকে লোহার টুকরা বেঁধে বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগরে ফেলে দেওয়া হয়।

সূর্য সেনের সম্মানে কলকাতা বাঁশদ্রোণী মেট্রো স্টেশনটির নামকরণ করেছে মাস্টারদা সূর্য সেন মেট্রো স্টেশন। এ ছাড়া তার সম্মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে আবাসিক হলের নামকরণ করা হয়। রাউজানের সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী সূর্য সেন তোরণ, সূর্য সেন কমপ্লেক্স ও পাঠাগার নির্মাণ করেন। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি অগ্নিযুগের বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনসহ ব্রিটিশ বিপ্লবের স্মৃতিবিজড়িত স্থান পরিদর্শনে এসেছিলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি।  তিনি রাউজানের সূর্য সেন স্মৃতি পাঠাগারের জন্য মানিনী চ্যাটার্জির ‘ডু অ্যান্ড ডাই’ বইটি উপহার দেন।

সম্পাদনা-এসপিটি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*